মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করা হয় যেভাবে

আমরা প্রায়ই শুনে থাকি মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ (১৩.৭৮৭ ± ০.০২০) বিলিয়ন বছর। কিন্তু প্রশ্ন জাগতে পারে – কীভাবে মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করা হয়? আজকের আলোচনা মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করার পদ্ধতি নিয়ে।

মহাবিশ্বের বয়স মূলত দুইভাবে নির্ণয় করা হয়।
১. সবচেয়ে পুরোনো তারার বয়স নির্ধারণের মাধ্যমে।
২. মহাবিশ্ব প্রসারণের গতি ব্যবহার করে।

তারার মাধ্যমে

এক্ষেত্রে গ্লোবিউলার ক্লাস্টার (Globular cluster)-কে ধন্যবাদ দিতে হয়। গ্লোবিউলার ক্লাস্টার কী? – গ্লোবিউলার ক্লাস্টার হলো একই জায়গায় মিলেমিশে সুখী পরিবারের মতো বাস করা অনেকগুলো তারা। অনেকগুলো বলতে কি ১০-১২টা? – না, কোটি-কোটি তারা নিয়ে একেকটি ক্লাস্টার গঠিত হয়। ১০-১২ এই সংখ্যার কাছে নগন্য!

মনে করুন, আমরা ক্লাস্টারের কেন্দ্রে আছি। আমাদের সবচেয়ে কাছের তারা বা নক্ষত্র কোনটা? (সূর্য বাদে!) – প্রক্সিমা সেন্টোরাই (Proxima Centauri)। তো, তখন অতীতে এই প্রক্সিমা সেন্টোরাই চেয়েও অনেক কাছে আরও হাজারটা তারা থাকত। থাক সে কথা, তারাদের কথায় আসি। তারার আয়ু মূলত তার ভরের ওপর নির্ভর করে। যত বেশি ভর, তত আয়ু কম। মোটাসোটা, ভুঁড়ি বেশি, খায়ও বেশি, তাই জ্বালানি তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।

মহাবিশ্বের eBOSS 3D মানচিত্রের একটি অংশ। এই মানচিত্রটি মহাবিশ্বের ১১ বিলিয়ন বছরের ইতিহাস দেখায়, পৃথিবীর নিকটতম গ্যালাক্সি বেগুনি এবং নীল রঙে এবং দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলিকে হলুদ এবং লাল রঙে দেখানো হয়েছে৷ ক্রেডিট: Swiss Federal Institute of Technology (EPFL)
মহাবিশ্বের eBOSS 3D মানচিত্রের একটি অংশ। এই মানচিত্রটি মহাবিশ্বের ১১ বিলিয়ন বছরের ইতিহাস দেখায়, পৃথিবীর নিকটতম গ্যালাক্সি বেগুনি এবং নীল রঙে এবং দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলিকে হলুদ এবং লাল রঙে দেখানো হয়েছে৷ বিস্তারিত
ক্রেডিট: Swiss Federal Institute of Technology (EPFL)

সূর্যের অর্ধেক ভুঁড়ির তারা ২০ বিলিয়ন বছর বাঁচবে।
সূর্যের মতো একটা তারা প্রায় ৯ বিলিয়ন, এর দ্বিগুণ হলে ৮০০ মিলিয়ন। আর দশগুণ হলে?
কী মনে হয়? – কমতে কমতে একেবারে ২০ মিলিয়ন।
ইশ! মোটা তারাদের জীবনটা বড়োই দুঃখের।
থাক, আফসোস করতে হবে না। আয়ু কম হলেও তারা যত ভারী হবে, তাদের উজ্জ্বলতাও তাল মিলিয়ে বাড়বে, তাদের জীবন তত বৈচিত্র্যময় হবে।

একটি ক্লাস্টারের সবগুলো তারা প্রায় একই সময়ে গঠিত হয়। আর তারার উজ্জ্বলতা, ভর এইসব সূর্যের সাথে তুলনা করে তারাগুলোর বয়স নির্ধারণ করা হয়। একটি ক্লাস্টারের তারা যদি সূর্যের চেয়ে প্রায় ১,০০০ গুণ উজ্জ্বল হয় তাহলে এর ভর হবে প্রায় ১০ গুণ। সাথে বয়স প্রায় ২০ মিলিয়ন।
তো, সবচেয়ে পুরোনো যে ক্লাস্টার আছে, তার তারার ভর সূর্যের ০.৭ গুণ।

৯ বছর ধরে WMAP -এর তোলো ব্যাকগ্রাউন্ড কসমিক রেডিয়েশনের চিত্র (২০১২)। ক্রেডিট: NASA / WMAP Science Team
৯ বছর ধরে WMAP -এর তোলো ব্যাকগ্রাউন্ড কসমিক রেডিয়েশনের চিত্র (২০১২)।
ক্রেডিট: NASA / WMAP Science Team

ক্যুল! তাহলে এর বয়স হবে ১১ থেকে ১৪ বিলিয়ন বছর।
নাসার WMAP (Wilkinson Microwave Anisotropy Probe) এর ৯ বছর ধরে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, এই তারাগুলো তৈরি হয়েছিল মহাবিশ্ব তৈরির প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর পর।
তাহলে বলুন তো মহাবিশ্বের বয়স কত? – যোগ করলেই হয়ে যাবে।

২০১২ সালে WMAP এর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৭৭২ (১৩.৭৭২ ± ০.০৫৯) বিলিয়ন বছর।

মহাবিশ্বেরর প্রসারণের হিসাব থেকে

১৯২৫ সাল। পাইপমুখে জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল পায়চারি করছেন। তাঁর মাথায় ঘূর্ণিঝড় বয়ে চলেছে। মহাবিশ্ব আসলেই প্রসারিত হচ্ছে। আইনস্টাইন আঙ্কেলকে আবার সূত্র ঠিক করতে হবে! মহাবিশ্বের এই প্রসারণটা কত দ্রুত সেটাকেই বলে হাবল ধ্রুবক (Hubble constant)। এইটাকে প্রকাশ করা হয় H₀ দিয়ে। মহাবিশ্ব যখন গঠিত হচ্ছিল, তখন যে মুক্ত ফোটনগুলো ছিল; মহাবিশ্বের প্রসারণের সাথে এগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যও বেড়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা পেনসিল ঠুকে হিসেব কষে দেখেছেন, এগুলো এখন মাইক্রোওয়েভে পরিণত হয়েছে‍‍‌। এটাকে বলা হয় কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন, সংক্ষেপে CMBR বা CMB।

নাসার COBE (Cosmic Background Explorer, ১৯৮৯ থরকে ১৯৯৩), WMAP (Wilkinson Microwave Anisotropy Probe, ২০০১ থেকে ২০১০), ইউরোপিয়ান স্পেইস এজেন্সির Planck (২০০৯ থেকে ২০১৩) আওতাধীন প্রজেক্টগুলোর মাধ্যমে CMBR ডিটেক্ট করে মহাবিশ্ব কত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে সেটা বের করা যায়। যাক সে কথা। সেটা আজকের মূখ্য আলোচনার বিষয় নয়।

COBE, WMAP এবং Planck দ্বারা পর্যবেক্ষণকৃত কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের ফলাফলের তুলনা। ক্রেডিট: NASA/JPL-Caltech/ESA
COBE, WMAP এবং Planck দ্বারা পর্যবেক্ষণকৃত কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের ফলাফলের তুলনা।
ক্রেডিট: NASA/JPL-Caltech/ESA

যেহেতু স্পেইস প্রসারিত হচ্ছে এবং কত দ্রুত এবং কী হারে প্রসারিত হচ্ছে তা জানতে পরেছি আমরা। তো এসব তথ্য দিয়েই বিজ্ঞানীরা ঘড়িটাকে উলটা দিকে চালাতে শুরু করেন। স্বাভাবিকভাবেই অনেকক্ষণ রোলার ঘোরানোর পর আসে বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্বের প্রথম দিকে অবস্থা! এর মাধ্যমেও মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করা সম্ভব।

মহাবিশ্বের বয়স কত বছর?

২০১২ সালের WMAP এর হিসাব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের বয়স হলো ১৩.৭৭২ বিলিয়ন বছর। আর ২০১৮ সালের Planck মহাকাশ মানমন্দিরের মতে, এই সংখ্যা ১৩.৭৮৭ (১৩.৭৮৭ ± ০.০২০) বিলিয়ন বছর। আর এইটাই এখন পর্যন্ত পাওয়া সঠিক হিসাব।

হাবল ধ্রুবকবে আরও নিখুঁত করা নাসার স্পিটজার স্পেইস-টেলিস্কোপ এর প্রধান Wendy Freedman এর ভাষায়,
কয়েক দশক আগেও একই বাক্যে ‘precision’ আর ‘cosmology’ ব্যবহার অসম্বভ ছিলো, এবং মহাবিশ্বের আকার ও বয়সের ক্ষেত্রে দু-একই ব্যাপার ব্যাতীত ভাল ভাবে জানা ছিলো না। আর এখন আমরা কয়েক শতাংশের নির্ভলতার হিসাব করছি। এটা বেশ অসাধারণ একটি ব্যাপার

তথ্যসূত্র:

AllEscort