লজ্জাবতী বানর: গঠন, আচরণ, বাসস্থান

বাঁদরের বাঁদরামি” –কথাটা যাদের সাথে একেবারেই যায় না। শান্ত, ধীর-স্থির প্রকৃতির অনন্য সুন্দর এই প্রাণীটি বাংলার বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। নির্বিচারে বন ধ্বংস ও চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্যে ক্রমেই বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। International Union for Conservation of Nature (IUCN) এর IUCN Red List -এ এদেরকে বিপন্নপ্রায় প্রাণী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ১৯৭৪ ও ২০১২ এর তফসিল ১ অনুযায়ীও সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় রয়েছে এরা।

রাতে গাছে থাকা প্রাপ্ত বয়স্ক বাংলা লজ্জাবতী বানর। 📸 黄秦 (Huáng Qín) 📍 Myitkyina, MM-KC, China 🗓️ August 2017
রাতে গাছে থাকা প্রাপ্ত বয়স্ক বাংলা লজ্জাবতী বানর।
📸 黄秦 (Huáng Qín)
📍 Myitkyina, MM-KC, China
🗓️ August 2017

লজ্জাবতী বানরের অনেকগুলো প্রজাতি রয়েছে। আমাদের দেশে যাদের দেখা যায় তাদের নাম হলো ‘বাংলা লজ্জাবতী বানর’। ইংরেজিতে এদের নাম Bengal Slow Loris বা Northern Slow Loris. ধীরগতি ও অলস স্বভাবের কারণে এই নাম পেয়েছে এরা। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়েই এই বানরের দেখা পাওয়া যায়। নিশাচর লজ্জাবতীরা দিনের বেলায় দেখা দেয় না সহজে। তবে যখনই কারুর দেখা পায়, দু-পায়ের মাঝখানে মাথা গুঁজে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলে; যেন ভীষণ লজ্জা পেয়েছে। এমন মুখ লুকোনো স্বভাবের কারণে এদেরকে আদর করে মুখচোরা বানর  নামেও ডাকা হয়।

শ্রেণিবিন্যাস:

জগৎ: Animalia
পর্ব: Chordata
শ্রেণি: Mammalia
বর্গ: Primates
উপবর্গ: Strepsirrhini
পরিবার: Lorisidae
গণ: Nycticebus
প্রজাতি: N. bengalensis
বৈজ্ঞানিক নাম: Nycticebus bengalensis

লজ্জাবতীরা অন্যান্য বানরের চাইতে গঠন ও চেহারায় আলাদা। অন্য বানরদের তুলনায় সহজেই পৃথক করা যায় তাদের। মাঝারি আকৃতির বানরগুলোর পিঠ ধূসর বাদামি পশমে আবৃত হয় এবং নিতম্বের দিকটা সাদা পশমে আবৃত থাকে। সামনের অংশে বুক এবং পেট সাদা কিংবা ধূসর পশমে ঢাকা থাকে, এর উপর কালো বা বাদামী ছোপও থাকতে পারে। গোলগাল মাথার উপরে মাঝখান বরাবর একটি লম্বা কালো দাগ দেখতে পাওয়া যায়। মাথার দুপাশে দুদিকেও অনেক সময় কালো ছোপ থাকে। হাতগুলো ছোটো এবং সাদা, পা মসৃণ ও বিবর্ণ, এর সাথে থাকে ছোটো একটি লেজ। মাথার সামনে থাকে দুটো বড়ো বড়ো চোখ। বড়ো চোখগুলোয় রঙিন আলোকচ্ছটার প্রতিফলন দেখা যায়। এমন অনন্য গড়নের কারণে সহজেই চিহ্নিত করা যায় তাদের।

দিনের বেলা ঝুলে থাকা বাংলা লজ্জাবতী বানর। এরা সাধারণত দিনে বের হয় না, লুকিয়ে থাকে। 📸 Ángel Dolón 📍 Muang Nakhon Nayok, NN, Thailand 🗓️ December 2019
দিনের বেলা উল্টো ঝুলে থাকা বাংলা লজ্জাবতী বানর। এরা সাধারণত দিনে বের হয় না, লুকিয়ে থাকে।
📸 Ángel Dolón
📍 Muang Nakhon Nayok, NN, Thailand
🗓️ December 2019

লজ্জাবতী বানরেরা নিশাচর। দিনের বেলায় এদের খুব কম দেখা যায়। লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে তারা। খুব প্রয়োজন ছাড়া এরা সহজে বের হয় না, সবসময় গাছের মগডালে থাকে। তারা উলটো হয়ে ঝুলতে ভালোবাসে, মগডালে থেকে গাছের কঁচি পাতা চিবিয়ে খায়। এছাড়া এদের খাদ্য তালিকায় ছোটো ছোটো পোকামাকড়, ছোটো পাখি ও বিভিন্ন প্রাণীর ডিম রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো এরা হাত দিয়ে খাবার না খেয়ে সরাসরি মুখ দিয়ে খায়, একদম পাখিদের মতো।

স্ত্রী বানরেরা সাধারণত বছরে একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। মিষ্টি দেখতে এই বানরগুলো ২০ বছরের কাছাকাছি বাঁচে। প্রাইমেটদের মধ্যে এরা ভেনোমাস অর্থাৎ বিষধর। এদের কামড় ভয়ানক হতে পারে, যদিও এরা খুবই শান্ত এবং সহজে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর সংস্পর্শে আসে না।

বাংলা লজ্জাবতী বানরের ভৌগলিক পরিসর অন্য যেকোনো লজ্জাবতী বানর প্রজাতির চেয়ে বড়। ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলা লজ্জাবতী বানর (N. bengalensis) -কে সুন্ডা লজ্জাবতী বনারের (N. coucang) -এর একটি উপ-প্রজাতি হিসাবে বিবেচিত, কিন্তু পরে ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে বাংলা লজ্জাবতী বানর সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতি। 📸 Akrachai Aksornneam 📍 Dawei, TN, MM, Thailand 🗓️ April 2021
বাংলা লজ্জাবতী বানরের ভৌগলিক পরিসর অন্য যেকোনো লজ্জাবতী বানর প্রজাতির চেয়ে বড়। ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলা লজ্জাবতী বানর (N. bengalensis) -কে সুন্ডা লজ্জাবতী বনারের (N. coucang) -এর একটি উপ-প্রজাতি হিসাবে বিবেচিত, কিন্তু পরে ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে বাংলা লজ্জাবতী বানর সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতি।
📸 Akrachai Aksornneam
📍 Dawei, TN, MM, Thailand
🗓️ April 2021

ভারতীয় উপমহাদেশ এবং ইন্দোচীনে এই বানরদের দেখা পাওয়া যায়। তারা ঘন চিরসবুজ বনে বাস করে। আমাদের বাংলাদেশে চট্টগ্রাম ও সিলেটের ঘন সবুজ বন, রেমা কালেঙ্গা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আরো কিছু জায়গায় এদের দেখা পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে খাবারের অভাবে তারা লোকালয়ে চলে আসে। প্রায়ই বিভিন্ন জায়গা থেকে লজ্জাবতী উদ্ধার করার খবর শোনা যায়। কেউ কেউ আবার বনে ফিরে যেতে পারে, কারো ঠিকানা হয় চিড়িয়াখানার খাঁচায়।

দেখতে ভীষণ সুন্দর এই বানরেরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বন উজাড়করণ ও শিকারের বলি হচ্ছে প্রকৃতির অনন্য জীব বৈচিত্র‍্যগুলো।

এঁরা খাবারের খোঁজে মাঝে-মাঝে লোকালয়ে ঢুকে পরে। তেমনই একটি লজ্জাবতী বানর লোকালয়ের বৈদুতিক তারের ওপর নিরাপদে বসে আছে। 📸 Vijay Anand Ismavel 📍 Assam, India 🗓️ June 2017
এঁরা খাবারের খোঁজে মাঝে-মাঝে লোকালয়ে ঢুকে পরে। তেমনই একটি লজ্জাবতী বানর লোকালয়ের বৈদুতিক তারের ওপর নিরাপদে বসে আছে।
📸 Vijay Anand Ismavel
📍 Assam, India
🗓️ June 2017

বর্তমানে বাংলাদেশের জীবকুলের এমন অনন্য অনেক প্রাণীই ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যা প্রাকৃতিক ও বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যপ্রাণীদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র‍্য। বন উজাড় বন্ধ করে নিরাপদ অভয়ারণ্য সৃষ্টি করা না গেলে আগামী কয়েক বছরে অনেক প্রাণীই হারিয়ে যাবে বাংলার জীবের তালিকা থেকে। তখন হয়তো আর মিলবে না মুখ লুকোনো লজ্জাবতী বানরদের দেখা।

গ্যালারি:

📸 Helena Snyder 📍 Ben En National Park in Vietnam 🗓️ Unknown
📸 Helena Snyder
📍 Ben En National Park in Vietnam
🗓️ Unknown
📸 Unknown 📍 Vorobyi Birdpark, Vorobyi, Russia 🗓️ 2016
📸 Unknown
📍 Vorobyi Birdpark, Vorobyi, Russia
🗓️ 2016
ব্যাঙাচি এডিটর: আমি ২০১৫ সালে ইউক্রেনে গিয়েছিলাম। সেখানকার EKZOland চিড়িয়াখানাতে এক দুঃখ মনে লজ্জাবতী বানরের ছবি তুলেছিলাম আমার একদম এন্ট্রি লেভেল ক্যামেরা দিয়ে। Zoo Institute এর অফিশিয়াল ছবি গ্যালারিতে জায়গা করর নিয়েছিলো ছবিটি। 📸 Tanvir 📍 EKZOland, Kyiv, Ukraine 🗓️ 2015
ব্যাঙাচি এডিটর: আমি ২০১৫ সালে ইউক্রেনে গিয়েছিলাম। সেখানকার EKZOland চিড়িয়াখানাতে এক দুঃখ মনে লজ্জাবতী বানরের ছবি তুলেছিলাম আমার একদম এন্ট্রি লেভেল ক্যামেরা দিয়ে। Zoo Institute এর অফিশিয়াল ছবি গ্যালারিতে জায়গা করর নিয়েছিলো ছবিটি।
📸 Tanvir
📍 EKZOland, Kyiv, Ukraine
🗓️ July, 2015
📸 Unknown 📍 Almaty Zoo, Almaty, Kazakhstan 🗓️ 2019
📸 Unknown
📍 Almaty Zoo, Almaty, Kazakhstan
🗓️ 2019
📸 Unknown 📍 Mini-Zoopark Zhivaya Ekzotika, Bishkek, Kyrgyzstan 🗓️ 2019
📸 Unknown
📍 Mini-Zoopark Zhivaya Ekzotika, Bishkek, Kyrgyzstan
🗓️ 2019
📸 naturegirlkh 📍 Sylhet, Bangladesh 🗓️ 2016
📸 naturegirlkh
📍 Sylhet, Bangladesh
🗓️ 2016

 

তথ্যসূত্র:

AllEscort