বৈদ্যুতিক শকে কীভাবে মানুষ মারা যায়?

শরীরের ভেতর দিয়ে যখন বিদ্যুৎ যায়, সেটা শরীরের কিছু ক্ষতি করতে পারে। তাপ বাড়িয়ে আগুনের মতো পুড়িয়ে দিতে পারে, ফুসফুস প্যারালাইজ করে দিয়ে অক্সিজেনের অভাবে মেরে ফেলতে পারে, হৃৎপিণ্ডের ছন্দ ভেঙে দিয়ে হার্ট অ্যাটাক ঘটাতে পারে।

অনেকে ভাবে, যত বেশি ভোল্টেজ, মারা যাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। আসলে মানুষ বা অন্য প্রাণী মারা যায় কারেন্টের পরিমাণের জন্য, ভোল্টেজের জন্য না। ৪০-৫০ ভোল্টেই মানুষ মারা যেতে পারে, যদি যথেষ্ট কারেন্ট তার শরীর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে ভোল্টেজ বাড়লে সাধারণত কারেন্টও বাড়ে এবং ভোল্টেজ শরীরের রোধ কমিয়ে দিয়ে এই ‘যথেষ্ট কারেন্ট‘ পরিবহনে সাহায্য করতে পারে। তাই ভোল্টেজের একটা পরোক্ষ প্রভাব আছে।

কত অ্যাম্পিয়ার যা হয়
১ বা তার বেশি মারাত্মক রকম পুড়ে যায়

নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়

০.২ হার্ট অ্যাটাক, সাম্ভাব্য মৃত্যু
০.১ নিঃশ্বাস নেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

কষ্ট করে নিঃশ্বাস নেয়া লাগে।

অনেক ব্যথা দেয়ার মত শক।

প্যারালাইসিস-ছাড়তে পারে না

ব্যথা দেয়ার মত শক

০.০১ ভালভাবেই টের পাওয়া যায়
০.০০১ অনুভব করা শুরু হয়

উপরের ছকে কত কারেন্টে শরীরে কী হবে, সেটার একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে। নিচের ছবিতে একই জিনিস আরও বিস্তারিত দেখানো হয়েছে। এখানে ভোল্টেজের কোনো উল্লেখ নেই, কারণ সেটার সরাসরি কোনো প্রভাব নেই।
প্রথমে কিছু সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা। এখানে ইচ্ছাকৃতভাবেই সহজ রাখার জন্য কিছু বিস্তারিত বর্ণনা বাদ দিয়েছি। এই লেখার জন্য সেগুলি দরকারি না।

বাম হাত থেকে পায়ে যাওয়ার সময়কাল T এবং এর কারেন্ট I এর প্রভাবের লগ-লগ গ্রাফ। ছবি: Cmglee ডেটা: “Effects of the Earth Current Frequency and Distortion on Residual Current Devices" Scientific Journal of Control Engineering (2013)
বাম হাত থেকে পায়ে যাওয়ার সময়কাল T এবং এর কারেন্ট I এর প্রভাবের লগ-লগ গ্রাফ।
ছবি: Cmglee ডেটা: “Effects of the Earth Current Frequency and Distortion on Residual Current DevicesScientific Journal of Control Engineering (2013).

১) শক কী?: শরীরের ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য আমাদের যে শারীরিক অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া হয়, সেটার নামই শক।

২) বিদ্যুৎ: কোনো মাধ্যম (তার ইত্যাদি) দিয়ে চার্জের (আধানের) প্রবাহ। ধরে নেওয়া যেতে পারে, এখানে চার্জ মানেই ইলেকট্রন এবং ইলেকট্রনের প্রবাহই বিদ্যুৎ।

৩) ভোল্টেজ বা বিভব: একটা মাধ্যমের দুই প্রান্তে চার্জের পরিমাণের পার্থক্য। (এটা অতি সরলীকরণ করা হয়েছে এই লেখার জন্য)। এটার একক ভোল্ট। বাংলাদেশে বাসার তারে ২২০-২৪০ ভোল্ট থাকে।

৪) কারেন্ট বা তড়িৎ প্রবাহ: চার্জের প্রবাহের হার। প্রতি সেকেন্ডে যত বেশি চার্জ যাবে, কারেন্ট তত বেশি। এটা মাপের একক অ্যাম্পিয়ার।

৫) রেজিস্ট্যান্স বা রোধ: কোনো মাধ্যমে চার্জ চলাচলে বাধার পরিমাণ। ধাতুতে এই বাধার পরিমাণ কম, বিশুদ্ধ পানিতে অসীম বাধা, কিন্তু একটু লবণ গুলে দিলেই আবার সেটার রোধ অনেক কমে যায়। শুকনা কাঠ, রাবার ইত্যাদিতেও রোধ অনেক বেশি। এটার একক ওহম। যেসব জিনিসের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ খুব ভালো চলে, সেগুলিকে সুপরিবাহী বলা হয়; যেগুলি দিয়ে ভালো চলে না, সেগুলি কুপরিবাহী। আর যেগুলি দিয়ে একদমই চলে না, সেগুলি অপরিবাহী। আমরা ওপরে বলেছি, ইলেকট্রনের প্রবাহ হচ্ছে বিদ্যুৎ। তাহলে এটা থেকে বোঝা যায়, সুপরিবাহীতে ইলেকট্রন সহজে চলে, অপরিবাহীতে চলে না।

৬) কোনো মাধ্যমের দুই প্রান্তে ভোল্টেজের তফাত না থাকলে সেটার ভেতর দিয়ে কারেন্ট যাবে না। ভোল্টেজ বাড়লে কারেন্ট বাড়বে, রোধ বাড়লে কারেন্ট কমবে। সুতরাং একটা মাধ্যমে কতটুকু কারেন্ট যাবে, সেটা নির্ভর করে ভোল্টেজ আর রোধের ওপর।

৭) একটা তুলনা দিই। মনে করি, একটা স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা প্রত্যেকে একটা চার্জ বা ইলেকট্রন। সোমবার সকাল ৬টার সময় সব ইলেকট্রন যার-যার বাসায়, স্কুলে একজনও নেই। সুতরাং, চার্জের পার্থক্য আছে দুই প্রান্তে (স্কুল ও বাসা)। স্কুলের সময় হলে সবাই স্কুলের দিকে যাবে (চার্জের প্রবাহ)। প্রতি মিনিটে কতজন গেইট পার হয়ে ঢুকছে, সেটা হচ্ছে কারেন্ট। যত বেশি ছাত্রছাত্রী (ভোল্টেজ), এই গেইট পার হওয়ার হার (কারেন্ট) তত বেশি। আর যদি তুমুল বৃষ্টি থাকে, রাস্তায় জ্যাম থাকে, সেগুলি হচ্ছে রোধ। রোধ যত বেশি, প্রতি মিনিটে কতজন গেইট পার হয়ে ঢুকছে, সেটার হার (কারেন্ট) কমতে থাকবে।

আর মানুষ যত জ্যামে পড়বে, স্কুলে যেতে যত দেরি হবে, মেজাজ/ভয় তত বাড়বে। তড়িৎ প্রবাহের সময়ও রোধ বেশি হলে তাপ বাড়তে থাকে। এর কারণ হচ্ছে, চার্জের চলাচলের যে শক্তিটা আছে, সেটা বাধাপ্রাপ্ত হলে তাপে পরিণত হয়। ইলেকট্রিক হিটার বা লাইট বাল্বের কাছে হাত নিলেই এই তাপ টের পাওয়া যায়।

সবশেষে, যদি বাসা থেকে স্কুলে যাওয়ার একাধিক পথ থাকে, তাহলে যে রাস্তায় জ্যাম কম, সেই রাস্তা দিয়ে বেশি ছাত্রছাত্রীরা যাবে। ঠিক তেমনই, কারেন্ট চলার যদি একের বেশি পথ থাকে, তাহলে যে পথে রোধ কম সেই পথ দিয়ে বেশি কারেন্ট যাবে।

অন্য যে-কোনো মাধ্যমের মতোই, মানুষের শরীরও একটা মাধ্যম এবং সেটার রোধ আছে। মানুষের শরীর শুকনা থাকলে মানুষের শরীরের গড় রেজিস্ট্যান্স বা রোধ হয় ৫০,০০০ থেকে ১০০,০০০ ওহম। ঘেমে গেলে (লবণাক্ত ও ভেজা) রোধ কমে যায়। চামড়ায় কাটা-ছেঁড়া থাকলে সেখানেও রোধ কমে যায়।

আমরা ওপরে দেখেছি, যত বেশি ভোল্টেজ, তত বেশি চার্জ এবং রোধের ভেতর দিয়ে চার্জ গেলে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। যত বেশি রোধ, তত বেশি তাপ।

তাহলে মানুষের শরীরে কী হবে? যদি যথেষ্ট ভোল্টেজ থাকে, তাহলে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে পুড়ে যাবে। চামড়া পুড়ে গিয়ে ক্ষত তৈরি হবে, সেখানে রোধ কমে যাবে, ফলে কারেন্টের প্রভাব বেড়ে যাবে।

শুনতে অবাক লাগে, কিন্তু আমাদের শরীর বিদ্যুৎ তৈরি করে এবং সেই বিদ্যুৎ আমাদের জন্য খুব জরুরি। আমরা যখন হাত-পা নাড়াতে চাই, আমাদের মস্তিষ্ক হাত-পা কে আমাদের নার্ভ দিয়ে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠিয়ে সেই কাজ করায়। মস্তিষ্কে চিন্তা-ভাবনাতেও বৈদ্যুতিক সংকেত গুরুত্বপূর্ণ।

(ক) স্থির অবস্থায় একটি নিউরনের তড়িৎ-রাসায়নিক অবস্থা (খ) একটি নিউরন যা সংকেত পাঠানোর কাজ করছে। হলুদ বৃত্তগুলি ঋণাত্বক চার্জযুক্ত আয়নকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং গোলাপী বৃত্তগুলি ধনাত্বক চার্জযুক্ত আয়নকে প্রতিনিধিত্ব করে। স্থির অবস্থায়, কোষের ভিতরে ঋণাত্বক আয়ন বেশি থাকে এবং কোষের বাইরে ধনাত্মক আয়ন বেশি থাকে, যে কারণে নিউরনের সামগ্রিকভাবে ঋণাত্বক ভোল্টেজ থাকে। যখন নিউরন সক্রিয় হয়, তখন ধনাত্মক আয়নগুলি কোষে ছুটে যায় এবং ঋণাত্বক আয়নগুলি দ্রুত বেরিয়ে আসে, যার ফলে কোষের ভিতরের ভোল্টেজকে সামগ্রিকভাবে ধনাত্মক করে তোলে। (গ) চার্জের এই পরিবর্তনটি তখন একটি নিউরণ থেকে আরেকটি নিউরণে যেতে থাকে এবং এভাবে শরীরের বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন সিগনাল ইলেক্ট্রিক এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক থেকে বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে দেয়।
(ক) স্থির অবস্থায় একটি নিউরনের তড়িৎ-রাসায়নিক অবস্থা (খ) একটি নিউরন যা সংকেত পাঠানোর কাজ করছে। হলুদ বৃত্তগুলি ঋণাত্বক চার্জযুক্ত আয়নকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং গোলাপী বৃত্তগুলি ধনাত্বক চার্জযুক্ত আয়নকে প্রতিনিধিত্ব করে। স্থির অবস্থায়, কোষের ভিতরে ঋণাত্বক আয়ন বেশি থাকে এবং কোষের বাইরে ধনাত্মক আয়ন বেশি থাকে, যে কারণে নিউরনের সামগ্রিকভাবে ঋণাত্বক ভোল্টেজ থাকে। যখন নিউরন সক্রিয় হয়, তখন ধনাত্মক আয়নগুলি কোষে ছুটে যায় এবং ঋণাত্বক আয়নগুলি দ্রুত বেরিয়ে আসে, যার ফলে কোষের ভিতরের ভোল্টেজকে সামগ্রিকভাবে ধনাত্মক করে তোলে। (গ) চার্জের এই পরিবর্তনটি তখন একটি নিউরণ থেকে আরেকটি নিউরণে যেতে থাকে এবং এভাবে শরীরের বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন সিগনাল ইলেক্ট্রিক এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক থেকে বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে দেয়।

আমাদের হৃৎপিণ্ডও সংকুচিত ও প্রসারিত হয় বৈদ্যুতিক সংকেত পেয়ে। সেই সংকেত যদি সময়মতো না পায়, তাহলে হৃৎপিণ্ড পাম্প করবে না, রক্ত চলাচল থেমে যাবে। আবার উলটা-পালটা সংকেত পেলে হৃৎপিণ্ড উলটা-পালটা পাম্প করা শুরু করবে। ফলাফল—হার্ট অ্যাটাক

আমরা যদি তাই কারেন্ট চলছে এমন কিছুতে হাত দিই তাহলে শিরশির অনুভূতি হতে পারে। এটা হচ্ছে নার্ভে বাইরের অপরিচিত কারেন্ট ঢোকার ফলাফল। নার্ভ সেই বৈদ্যুতিক সংকেত মস্তিষ্কে পাঠায়, মস্তিষ্ক এই অনুভূতি তৈরি করে। যদি কারেন্ট বাড়তে থাকে, একটা পর্যায়ে গিয়ে সেটা মস্তিষ্ক থেকে আসা সংকেতকে ছাপিয়ে যায় (বাসার পাশে প্রচণ্ড শব্দে মাইক বাজার মতো—পাশের লোকের কোনো কথা আর বোঝা যায় না)। ফলে মস্তিষ্ক যদি নির্দেশ দেয়, “পা, দৌড় দাও”, সেই সংকেত পায়ের পেশি পর্যন্ত আর যেতে পারে না। ফলাফল : প্যারালাইসিস। ফলে আটকে থেকেও মারা যেতে পারে মানুষ। তাকে টেনে ছাড়াতে গেলে সেই উদ্ধারকারীর নিজে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশে এরকম পরিস্থিতিতে কাঠের টুকরা দিয়ে পিটিয়ে ছোটাতে দেখা যায়।

বৈদ্যুতিক শকের সময় শরীরের মধ্য দিয়ে বর্তমান পথের উদাহরণ (Elektroschutz in 132 Bildern by Stefan Jellinek বই থেকে) উৎস: Dr. EH Jellinek
বৈদ্যুতিক শকের সময় শরীরের মধ্য দিয়ে বর্তমান পথের উদাহরণ (Elektroschutz in 132 Bildern by Stefan Jellinek বই থেকে)
উৎস: Dr. EH Jellinek

কারেন্ট আরও বাড়লে এই প্যারালাইসিস ফুসফুস পর্যন্ত যেতে পারে, ফলে প্রথমে নিঃশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে আসে এবং এক সময় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তারপর হয় সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা। কারেন্টের একটা বিশেষ পরিমাপে সেটা হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সংকেতের সাথে ঝামেলা করা শুরু করে। ফলে হৃৎপিণ্ড উল্টা-পাল্টা বিট করা শুরু করে এবং ফলে মৃত্যু হতে পারে। তার মানে ওই কারেন্টে হাত লাগা মানেই কি হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে? না, সব কারেন্ট হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। তবে যদি কেউ এক হাত দিয়ে তড়িৎপ্রবাহী তার ছোঁয় আর অন্য হাত দিয়ে মাটি ছোঁয়, তাহলে এক হাত থেকে আরেক হাতে কারেন্টের প্রবাহ হবে এবং সেটা খুব সম্ভবত হৃৎপিণ্ডের ভেতর দিয়েই যাবে। হাত দিয়ে তার ধরলে এবং পা যদি মাটিতে থাকে, তাহলেও হৃৎপিণ্ড দিয়ে কারেন্ট যেতে পারে। এছাড়াও, হৃৎপিণ্ডের পেশিরও ক্ষতি হতে পারে। কেউ যদি এক হাত বা এক পা দিয়ে তার ছোঁয় কিন্তু শরীরের বাকি অংশ বাতাস বাদে অন্য কিছুকে স্পর্শ না করে থাকে তাহলে হৃৎপিণ্ড দিয়ে কারেন্ট যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

বৈদ্যুতিক মায়োকার্ডিয়াল আঘাতের সাথে জড়িত প্রক্রিয়া।
বৈদ্যুতিক মায়োকার্ডিয়াল আঘাতের সাথে জড়িত প্রক্রিয়া।

কিন্তু কারেন্ট যদি সেই পরিমাপের (০.২ অ্যাম্পিয়ারের) ওপরে থাকে, তাহলে হৃৎপিণ্ডের পেশি আড়ষ্ট হয়ে যায়, ফলে উল্টা-পাল্টা বিট করতে পারে না। সাথে করে তাপমাত্রা এত বেড়ে যায় যে শরীরে আগুন লাগার মতো পুড়ে যায় এবং নিঃশ্বাসও বন্ধ হয়ে আসতে পারে। তাই ১১,০০০ ভোল্টের লাইনে ছোঁয়া লেগে নিমেষে হাত ছাই হয়ে গিয়েছে কিন্তু বেঁচে ফিরেছে এমন ঘটনা আছে, অথচ মাত্র ২২০ ভোল্টে মারা গিয়েছে, এমন ঘটনাও হয়।

প্রবন্ধের প্রথমদিকের এক ছকে দেখানো হয়েছে, ০.১- ০.২ অ্যাম্পিয়ারে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মৃত্যু হতে পারে। এছাড়াও কত কারেন্টে শরীরে কী হবে, সেটার একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ছবিতে একই জিনিস আরও বিস্তারিত দেখানো হয়েছে। সেখানে অনুভূমিক অক্ষে কারেন্টের পরিমাপ আর উল্লম্ব অক্ষে সময় দেখানো হয়েছে। সাথে করে ছবিতে রং দিয়ে বিপদের মাত্রা বোঝানো হয়েছে। প্রথম ছক আর দ্বিতীয় ছবিতে আপাতদৃষ্টিতে একটু তফাত আছে বলে মনে হয়। সেটার কারণ প্রথম ছবিতে সময়কে হিসাবে না নিয়ে অতি সরলীকরণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ছবিটি আবার দেয়া হলো।

বাম হাত থেকে পায়ে যাওয়ার সময়কাল T এবং এর কারেন্ট I এর প্রভাবের লগ-লগ গ্রাফ। ছবি: Cmglee ডেটা: “Effects of the Earth Current Frequency and Distortion on Residual Current Devices" Scientific Journal of Control Engineering (2013)

ছবির নীল AC-1 অংশে বিদ্যুতের পরিমাণ এক অ্যাম্পিয়ারের ১০ লক্ষ ভাগের মধ্যে ৫০০ ভাগ বা আরও কম (৫০০ μ অ্যাম্পিয়ার)। এখানে বিদ্যুতের প্রবাহ মানুষ টের পাবে না, যত সময় ধরেই চলুক না কেন।
সবুজ AC-2 অংশে টের পাবে, কিন্তু পেশিতে কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না প্রথমে। তবে যদি এক অ্যাম্পিয়ারের ১০০০ ভাগের ৫ ভাগ হয় (৫ মিলি অ্যাম্পিয়ার), তাহলে ৫ সেকেন্ডের পরে প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সেটা যদি ১০ মিলি অ্যাম্পিয়ার হয়, প্রতিক্রিয়া হবে ২ সেকেন্ডের মধ্যে। ১০০ মিলি অ্যাম্পিয়ার বা ০.১ অ্যাম্পিয়ার হলে প্রতিক্রিয়া হবে ০.১ সেকেন্ডে।

এই একই ০.১ অ্যাম্পিয়ার, প্রথম ছকের লাল অংশের শুরু, ২য় ছবিতে সময়ের অক্ষে দেখানো হয়েছে ৫০০ মিলি সেকেন্ড বা অর্ধেক সেকেন্ডে লাল অংশে চলে গিয়েছে। এই লাল অংশ হচ্ছে মারাত্মক ঝুঁকির ইঙ্গিত।

AC-4.1 এ পাঁচ শতাংশ ক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ড উল্টা-পাল্টা বিট করবে। ২য় ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এই AC-4.1 এলাকা সময়ের সাথে (যত ওপরে উঠছে) তত বামে সরছে (কম কারেন্টেও এটা হবে)। AC-4.2 এলাকাতে ৫০% ক্ষেত্রে হৃৎপিণ্ডের সমস্যা হবে। আর AC-4.3 তে ৫০% এর বেশি ক্ষেত্রে এই সমস্যা হবে।

দুইটা বিশেষ ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করি:

১) একটা বজ্রপাতে ৪০,০০০ থেকে ১,২০,০০০ ভোল্ট পর্যন্ত থাকতে পারে। আর কারেন্ট থাকতে পারে ৫,০০০ থেকে ২ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত (আকাশে যে বিদ্যুৎ চমকায়, সেখানে আরও অনেক বেশি থাকে)। তাহলে যেখানে বাসার ২২০ ভোল্ট, ১৫ অ্যাম্পিয়ারে মানুষ মারা যায়, ১১,০০০ ভোল্টের তারে লেগে হাত ছাই হয়ে যেতে পারে, সেখানে বজ্রপাতের পরেও মানুষ বাঁচে কীভাবে?

এটার একটা আভাস উপরের ছবিতে আংশিক দেওয়া আছে। উত্তরটা হচ্ছে সময়—এক সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময় এই ভোল্টেজ ও কারেন্ট থাকে। ফলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ার বা প্যারালাইসিস হওয়ার সময় পায় না। তবে সময় যত কমই হোক না কেন, এত ভোল্টেজের কারণে তাপমাত্রা একটু বাড়ে। ফলে মানুষ পুড়ে যায়, অনেকে মারাও যায়।

২) পাখি কীভাবে আহত/নিহত না হয়ে বিদ্যুতের তারে বসে? পাখির বেঁচে থাকার কারণ হচ্ছে, পাখির দুই পা একই তারে স্পর্শ করে থাকে। তার সুপরিবাহী, পাখির শরীর সুপরিবাহী না। কারেন্টের নিয়ম, যেই পথে বাধা বা রোধ কম, সেই পথ দিয়ে যাবে। ফলে সুপরিবাহী তার দিয়েই সব কারেন্ট যায়, পাখির শরীর দিয়ে যায় না, ফলে পাখির কিছু হয় না।
পাখিটার দুই পা যদি দুই ভোল্টেজের দুই তারে থাকত? তাহলে পাখির শরীর দিয়ে এক তার থেকে আরেক তারে বিদ্যুৎ যেত এবং পাখিটা মারা যেত। মাঝে মাঝে শরীরের দুই অংশ দুই তারে লেগে কাক বা অন্য পাখি মারা যায়।

তার মানে মানুষ কি এই কাজ করলে বেঁচে থাকবে? হ্যাঁ। কেউ যদি লাফ দিয়ে দুই হাত দিয়ে একটা ইলেকট্রিকের তার ধরে ঝুলে পড়ে, তার শরীর আর কিছু স্পর্শ না করে এবং বাতাসে জলীয় বাষ্প না থাকে, তাহলে সে পাখির মতোই শক খাবে না। এই পরীক্ষা যেন আবার কেউ না করে, কারণ কিছুতে ছোঁয়া লেগে গেলেই শেষ। তবে প্রতিদিন বহু বাসায় এর কাছাকাছি একটা ঘটনা ঘটে—স্পঞ্জের (অপরিবাহী) স্যান্ডেল বা ফ্লিপ-ফ্লপ পরে ইলেকট্রিশিয়ানরা বিদ্যুতের তারে হাত দেয়। শুধু ইলেকট্রিশিয়ানরা না, সাধারণ মানুষও হাত দিয়ে হালকা শক খায়, অথবা কোনো শকই খায় না। কারণ পায়ে অপরিবাহী স্যান্ডেল থাকায় তার শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ চলার কোনো পথ পায় না, ফলে বিদ্যুৎ পরিবাহী তার দিয়েই চলতে থাকে। আবারও বলছি, বাসায় এই পরীক্ষা কেউ করতে যেও না। সব স্যান্ডেল যে অপরিবাহী সেটার কোনো নিশ্চয়তা নেই; সেটা ছাড়াও অন্য দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

শেষ কথা—বিদ্যুৎ মারাত্মক জিনিস। না জেনে, যথেষ্ট সাবধানতা না নিয়ে এটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গেলে সাংঘাতিক আহত হওয়ার বা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

 

  • ভোল্টেজের আসল সংজ্ঞা হচ্ছে একটা চার্জকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে কতটুকু কাজ করা লাগে, তার পরিমাপ। তবে এটা এই লেখা বোঝার জন্য জানার দরকার নেই।
  • আমাদের শরীরে সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি রাসায়নিক পদার্থ আছে, যেগুলি সহজ করে বললে ব্যাটারির ভেতরের কেমিক্যালের মতো কাজ করে এবং শরীরের কোষগুলি ব্যাটারির মতোই বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। এটা থেকে শরীরে এইসব রাসায়নিকের সঠিক পরিমাণের গুরুত্বও বোঝা যায়।
  • মস্তিষ্ক যেহেতু বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠায় এবং মস্তিষ্ক নিজেও কাজ করে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে, তাই বিদ্যুৎ মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। বড়ো শক খেলে যেমন : বজ্রপাতে মানুষের বিষণ্নতা রোগ হতে পারে। এক সময়ে মানসিক রোগীকে শক দিয়ে চিকিৎসা করা হতো। এটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এখন আবার শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানেন না এটা ঠিক কীভাবে কাজ করে, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুব ভালো কাজ করে সেই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
  • অনেকের বিভিন্ন কারণে হৃৎপিণ্ডের সমস্যা থাকে। তাদের শরীরে অপারেশন করে পেইস-মেকার বলে একটা যন্ত্র বসিয়ে দেওয়া হয়, যেটার কাজ হচ্ছে হৃৎপিণ্ডকে নিয়মিত শক দিয়ে চালিয়ে রাখা। ইমপ্ল্যান্টেবল ডিফিব্রিলেটর বলে আরেক ধরনের যন্ত্র আছে, যেটা হৃৎপিণ্ডের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এবং দরকার হলে বিশাল শক দিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃৎপিণ্ডকে আবার চালিয়ে দেয়। সিনেমায় মাঝে মাঝে এই ধরনের জিনিস দেখা যায়, তবে সেটা বাইরে থেকে শক দিয়ে হৃৎপিণ্ডকে আবার চালু করে।

রেফারেন্স:
Waldmann V, Narayanan K, Combes N, Jost D, Jouven X, Marijon E. Electrical cardiac injuries: current concepts and management. Eur Heart J. 2018 Apr 21;39(16):1459-1465. doi: 10.1093/eurheartj/ehx142. PMID: 28444167.

মিরর লিঙ্ক

 

AllEscort