বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সমাচার: আছে যত কথা

১.
১২ মে ২০১৮ সালে উৎক্ষেপন করা হয় বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট। বাংলাদেশ সরকার স্যাটেলাইট নিয়ে ভাবছে জানার পরে ২০১০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত আমি এটা নিয়ে সরকারের সাথে কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু বিভিন্ন কারণে সফল হতে পারিনি। সায়েন্স ফিকশন এবং ইংরেজ লেখক আর্থার সি ক্লার্কের (কেন, পরে বলছি) বিশাল ভক্ত হিসাবে আগেই স্যাটেলাইট নিয়ে পড়াশোনা ছিল এবং এই কাজের জন্য একটা ফ্রেঞ্চ কন্সাল্টিং কোম্পানির সাথে কিছু কাজ করেছিলাম। তখন জানা/শেখা কিছু তথ্য শেয়ার করছি।

এই লাইনের কেউ স্যাটেলাইট শব্দটা ব্যবহার করতে চায় না। সবাই বলে, ‘স্পেইসক্রাফট’ অথবা ‘বার্ড’। এটা ছিল প্রথম শিক্ষা, যদিও আমি এটাতে অভ্যস্ত হতে পারিনি।

ধরুন বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট একটু আগে উড়ে গেল। এটা একটা জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট (Geostationary Satellite)। যদি জিওস্টেশনারি না হয়, তাহলে সেই স্যাটেলাইট থেকে হয় সারাদিন কাভারেজ পাওয়া যাবে না; অথবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্রাউন্ড স্টেশনের অ্যান্টেনা স্যাটেলাইটের সাথে সাথে ঘুরতে বা নড়তে হবে, যাতে খরচ বেড়ে যায়।

সব স্যাটেলাইট জিওস্টেশনারি হতে পারে না, দরকারও নেই। কিন্তু যেসব স্যাটেলাইট জিওস্টেশনারি, তাদের দুইটা বৈশিষ্ট্য থাকে:

১. তারা বিষুবরেখার ঠিক ওপরে অবস্থান করে। (এক ডিগ্রি কম/বেশি হতে পারে)

২. পৃথিবী যেমন নিজের অক্ষকে কেন্দ্র করে ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘুরে আসে, এই স্যাটেলাইটগুলোও পৃথিবীর অক্ষকে কেন্দ্র করে ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘুরে আসে।

এই দুই শর্তের ফলাফল—পৃথিবীর ঘোরার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এই স্যাটেলাইটগুলি পৃথিবীপৃষ্টের একটা নির্দিষ্ট এলাকার ওপর থেকে যায়। অর্থাৎ, জিও (পৃথিবী বা ভূ) স্টেশনারি (স্থির) হয়ে যায়। আসলে স্থির নয়; বন্দুকের গুলির চাইতেও দ্রুত চলছে তবে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হবে স্থির)।

১৯৬৩ সালে নাসার পাঠানো Syncom 3 ছিল বিশ্বের প্রথম জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট। এটি প্রশান্ত মহাসাগরে ১৮০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে বিষুবরেখার উপরে স্থাপন করা একটি পরীক্ষামূলক জিওসিঙ্ক্রোনাস কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট ছিল। স্যাটেলাইটটি জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ১৯৬৪ সালের অলিম্পিক গেমসের লাইভ টেলিভিশন কভারেজ প্রদান করে। ১৯৬৫ সালে ১লা জানুয়ারি স্যাটেলাইটটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয় যেটা তারা ভিয়েকনাম যুদ্ধের কমিউনিকেশন স্যাটেলাইন হিসেবে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে। ছবি: NASA
১৯৬৩ সালে নাসার পাঠানো Syncom 3 ছিল বিশ্বের প্রথম জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট। এটি প্রশান্ত মহাসাগরে ১৮০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে বিষুবরেখার উপরে স্থাপন করা একটি পরীক্ষামূলক জিওসিঙ্ক্রোনাস কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট ছিল। স্যাটেলাইটটি জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত ১৯৬৪ সালের অলিম্পিক গেমসের লাইভ টেলিভিশন কভারেজ প্রদান করে। ১৯৬৫ সালে ১লা জানুয়ারি স্যাটেলাইটটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয় যেটা তারা ভিয়েকনাম যুদ্ধের কমিউনিকেশন স্যাটেলাইন হিসেবে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে।
ছবি: NASA

বিষুবরেখার ওপরে মানে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে বিষুবরেখা বরাবর অসংখ্য লাইন টেনে যদি আকাশে বাড়ানো হয়, জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইটগুলি সেই লাইনের ওপরে থাকবে। কিন্তু এই দূরত্ব অসীম নয়; নিউটন আর কেপলারের কয়েকশ বছর আগে আবিষ্কার করা সূত্র অনুযায়ী আমরা জানি, জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৫,৮৫৩ কিলোমিটার দূরে থাকবে। এটাকে জিওস্টেশনারি অরবিট (বাংলা করলে হয় ভূস্থির কক্ষপথ) বলা হয়। এটাকে সায়েন্স ফিকশন লেখক আর্থার সি ক্লার্কের নামে ক্লার্ক অরবিটও বলা হয়, কারণ তিনি ১৯৪৫ সাল তৎকালিন “Wireless World” নামের এক ব্রিটিশ ম্যাগাজিনে “Extra-Terrestrial Relays: Can Rocket Stations Give Worldwide Radio Coverage?” শীর্ষক এক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম যোগাযোগ স্যাটেলাইটের এই ধারণা দিয়েছিলেন।

১৯৫২ সালে ওয়াশিংটন, ডিসি-র একটি বাড়িতে আর্থার সি. ক্লার্ক তার ‘Exploration of Space’ বইয়ের একটি অনুলিপি হাতে নিয়ে আছে। ছবি: AP Images
১৯৫২ সালে ওয়াশিংটন, ডিসি-র একটি বাড়িতে আর্থার সি. ক্লার্ক তার ‘Exploration of Space’ বইয়ের একটি অনুলিপি হাতে নিয়ে আছে।
ছবি: AP Images

যে-কোনো স্থায়ী কক্ষপথের একটা আজব গুণ আছে—এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে মহাকর্ষ আর ঘূর্ণনের গতিতে কাটাকাটি হয়ে যায় বলে সেই কক্ষপথের যাত্রী (সেটা আমাদের পৃথিবী বা চাঁদ, যেটাই হোক না কেন) একইভাবে ঘুরতে থাকে। স্যাটেলাইটগুলিও একইভাবে ভূস্থির কক্ষপথেও ঘুরতে থাকে। কিন্তু কীভাবে সেটা পৃথিবীর সাথে তাল রাখে? (আসলে এত সূক্ষ্মভাবে গতি রাখা অসম্ভব; তাই স্যাটেলাইটে গ্যাস থাকে যা উচ্চচাপে বের করে দিয়ে রকেটের মতো অবস্থান ঠিক করে নেয় মাঝে মাঝে।)

কেন এটি স্থির?

ধরুন, আপনি ছয় ইঞ্চি ব্যাসার্ধের একটা বৃত্ত আঁকলেন আর একই কেন্দ্র ধরে ৪২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের আরেকটা বৃত্ত আঁকলেন। আপনার আঁকার গতি যদি একই থাকে, তাহলে বড়ো বৃত্তটা আঁকতে বেশি সময় লাগবে, তাই না? কিন্তু যদি বড়ো বৃত্তটা আঁকার গতি বাড়িয়ে দেন, তাহলে কোনো একটা গতিতে চললে দেখা যাবে, দুইটা বৃত্ত একই সময়ে শুরু এবং শেষ করা যাচ্ছে অর্থাৎ, ছোটো বৃত্তের পেন্সিল আর বড়ো বৃত্তের পেন্সিল একই তালে চলছে। একইভাবে জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট পৃথিবীর চেয়ে দ্রুত চলে বলে মনে হয় এটি এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে।

স্যাটেলাইটের যোগাযোগ মডিউলটি ফ্রান্সের টুলুসে অবস্থিত থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের প্ল্যান্টে যুক্ত করা হয়েছিল। ছবি: Thales Alenia Space
স্যাটেলাইটের যোগাযোগ মডিউলটি ফ্রান্সের টুলুসে অবস্থিত থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের প্ল্যান্টে যুক্ত করা হয়েছিল।
ছবি: Thales Alenia Space

কেন এটি উড়ে চলে যাচ্ছে না বা পড়ে যাচ্ছে না?

প্লেন বা রকেট আকাশে উড়তে পারে জ্বালানি খরচ করে। কিন্তু স্যাটেলাইট কীভাবে ভেসে থাকে, ইঞ্জিন না চালিয়েই? রকেটে করে প্রথমে স্যাটেলাইটটাকে সোজা ওপরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর রকেটটা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘণ্টায় প্রায় ১১,০০০ কি.মি./ঘন্টা গতিতে চলতে শুরু করে এবং একসময় স্যাটেলাইটটাকে ছেড়ে দেয়। ছেড়ে দেওয়া স্যাটেলাইটটাও গতিজড়তার কারণে একই গতিতে চলতে থাকে। এই গতির জন্য, যদিও স্যাটেলাইট পৃথিবীর আকর্ষণে নিচের দিকে নেমে আসে কিন্তু এই নেমে আসার পরিমাণ কক্ষপথের বক্রতার সমান। তাই পৃথিবী থেকে দূরত্ব সমান থেকে যায়। যদি এই গতি কম হতো, তাহলে এক সময় পড়ে যেত, আর যদি একটু বেশি হতো তাহলে উপবৃত্তাকার (elliptical) হয়ে যেত। এটা বুঝতে একটু অসুবিধা হয়, তাই একটা উপমা দিই। ধরুন, বৃষ্টির কারণে ঢাকার রাস্তায় জলাবদ্ধতার জন্য পানি জমে আছে। আপনি একটা ব্যাগ নিয়ে হাঁটছেন। ব্যাগটা পানি থেকে ৩৮ ইঞ্চি ওপরে। হাঁটতে হাঁটতে পানি গভীর হলো। আপনি ব্যাগটা আরেকটু ওপরে তুললেন, যাতে ব্যাগটা পানি থেকে সেই ৩৮ ইঞ্চি ওপরেই থাকে। একইভাবে স্যাটেলাইটটাও সমান উচ্চতা বজায় রাখতে পারে। খটকা লাগছে?

রকেটে স্যটেলাইট নিয়ে একটি নির্দিষ্ট (নির্ভর করে অরবিটের ওপর) বেগে পৃথিবীকে ঘুড়তে থাকে এবং তারপর রকেট যখন স্যটেলাইটকে ছেড়ে দেয় তখন স্যটেলাইটটি গতি জড়তার জন্য সেই ভরবেগ নিয়ে ঘুড়তে থাকে। এদিকে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল স্যাটেলাইটকে নিজের দিকে টানে। স্যটেলাইটটির বেগ; পৃথিবীর অভিকর্ষ বল দ্বারা টেনে নিজের দিকে আনার বল সমান হয়। তখন লব্ধি বরাবর স্যাটেলাইট বৃত্তাকার পথে চলতে থাকে। এরকম একটি কয়েক হাজার বছর ঘুড়তে পারে। মাথায় ভোঙ্গে পারার চিন্তা নেই।
রকেটে স্যটেলাইট নিয়ে একটি নির্দিষ্ট (নির্ভর করে অরবিটের ওপর) বেগে পৃথিবীকে ঘুড়তে থাকে এবং তারপর রকেট যখন স্যটেলাইটকে ছেড়ে দেয় তখন স্যটেলাইটটি গতি জড়তার জন্য সেই ভরবেগ নিয়ে ঘুড়তে থাকে। এদিকে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল স্যাটেলাইটকে নিজের দিকে টানে। স্যটেলাইটটির বেগ; পৃথিবীর অভিকর্ষ বল দ্বারা টেনে নিজের দিকে আনার বল সমান হয়। তখন লব্ধি বরাবর স্যাটেলাইট বৃত্তাকার পথে চলতে থাকে। এরকম একটি কয়েক হাজার বছর ঘুড়তে পারে। মাথায় ভোঙ্গে পারার চিন্তা নেই।

প্রায় ৪২,০০০ কি.মি. ব্যাসার্ধের বৃত্তের পরিধি প্রায় ২,৬৪,০০০ কিলোমিটার (2πr)। এক কিলোমিটার দূরে দূরে রাখলেও ২,৬৪,০০০ স্যাটেলাইটের জায়গা আছে, তাই না? কাগজে কলমে তাই, কিন্তু বাস্তবে নয়।

থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ছিল বঙ্গবন্ধু-১ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটের প্রধান ঠিকাদার। ছবি: Thales Alenia Space
থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ছিল বঙ্গবন্ধু-১ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটের প্রধান ঠিকাদার।
ছবি: Thales Alenia Space

এখানে গরিব দেশগুলির জন্য একটা ঝামেলা হয়েছে। সেই ঝামেলা কী সেটা বলার আগে ফুটপ্রিন্ট কী জেনে নিই। দূর থেকে টর্চের আলো যেমন একটা আলোকিত বৃত্ত তৈরি করে, তেমনি স্যাটেলাইটের রেডিয়ো সিগন্যাল শুধুমাত্র একটা এলাকা থেকে পাওয়া যায়। সেই এলাকাটাকে সেই স্যাটেলাইটের ফুটপ্রিন্ট বা পদচিহ্ন বলা হয়ে থাকে। রাতের আকাশে যেমন সূর্য পৃথিবীর আড়ালে পড়ে যায়, তেমনি আমেরিকার আকাশে জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট বাংলাদেশের জন্য পৃথিবীর আড়ালে—বাংলাদেশ সেই স্যাটেলাইটের ফুটপ্রিন্টে নেই এবং সেই স্যাটেলাইট দিয়ে বাংলাদেশের কোনো কাজ হবে না। সুতরাং, বাংলাদেশের জন্য এমন জায়গায় স্যাটেলাইট স্থাপন করা লাগবে যাতে বাংলাদেশ তার ফুটপ্রিন্টে পড়ে। কোথায় স্যাটেলাইট বসবে, সেই জায়গাগুলিকে বলা হয় অরবিটাল স্লট (কক্ষঘর) এবং Internanational Telecommunication Uniton (ITU) প্রতিটি দেশকে ‘আগে এলে আগে পাবে’ এই ভিত্তিতে স্লট দিয়ে বরাদ্দ থাকে। ক্যাচালটা এইখানেই—বাংলাদেশের ওপরে বা আশেপাশের সব স্লট অন্য কিছু দেশ নিয়ে নিয়েছে (নিচে তালিকা)। বাংলাদেশ আগে চায়নি, তাই পায়নি। আবার অনেক দেশ নিজেদের স্যাটেলাইট দরকার নেই, তাই স্লট বিক্রি করেছে। যেমন: টংগা নিজেদের পাঁচটা স্লট বছরে ২ মিলিয়ন ডলার দরে ১৯৮৮ সালে নিলাম করেছে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি ১৫ বছরের জীবনকালের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ছবি: Thales Alenia Space / Xavier Boymond
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি ১৫ বছরের জীবনকালের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
ছবি: Thales Alenia Space / Xavier Boymond

বাংলাদেশের উপরের স্লটগুলি কাদের হাতে?

বাংলাদেশের অবস্থান ৯০.৩৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাতে। ৯০ ডিগ্রির উপরের স্লটগুলি এবং মালিকানা দিলাম এখানে—

90…………CYP…..KYPROS-APHRODITE-2
90…………USA…..USGAE-3A C
90…………CHN…..GC-11B
90.5………J………..QZSS-GS1
90.7………J………..DRTS-90.75E
90.75…….J………..DRTS-90.75E

প্রথম সংখ্যা হচ্ছে দ্রাঘিমাংশ (longitude), তার পরে কোন দেশ (CYP – Cyprus, USA – United States of America, CHN – China, J – Japan)। মনে রাখবেন যে জিওস্টেশনারি হতে হলে বিষুবরেখার ওপরে বা অতি অল্প বাইরে হতে হবে, অর্থাৎ অক্ষাংশ (latitude) ০ বা তার কাছাকাছি হতে হবে। অক্ষাংশ ১ এর বেশি হলে সেটা আর জিওস্টেশনারি থাকতে পারে না, সেটা জিওসিনক্রোনাস, বাংলা ৪ এর মত প্যাঁচানো অবস্থান হয় আকাশে।

৫ ডিগ্রি ডানে-বামের স্যাটেলাইটের তালিকা পাবেন এই লিঙ্কে

দক্ষিণ গোলার্ধে সমুদ্রের ওপরে অনেক জায়গা আছে, যেখানে কোনো জমি নেই, কোনো মানুষ থাকে না। সেই ফুটপ্রিন্টে স্লট পাওয়া যায়, কিন্ত সেটা নিয়ে কী হবে?

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর অবস্থান, বাংলাদেশর অবস্থান এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ফুটপ্রিন্ট। ছবি: Satbeams
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর অবস্থান, বাংলাদেশর অবস্থান এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ফুটপ্রিন্ট। উৎস: Satbeams

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম হয়ে গিয়েছে যে আপনি থাকেন চট্টগ্রামে এবং চাইলেই আপনি ৩,০০০ মাইল দূরে সমুদ্রের দখল কিনতে পারেন। কিন্তু আপনার দরকার বাসা বানিয়ে থাকা; সমুদ্রের পানির দখল নিয়ে কী করবেন? সুতরাং, আপনাকে এখন দাম দিয়ে অন্যের কাছ থেকে চট্টগ্রামেই জমি কেনা লাগবে।

স্যাটেলাইটের জন্যও জরুরি আমাদের সেই ফুটপ্রিন্টে থাকা—সমুদ্রের পানি কিনলে চলবে না। অতএব, বাংলাদেশ সেটাই করেছে। ১১৯.১ ডিগ্রি দ্রাঘিমাতে একটা স্লট লিজ নিয়েছে ১৫ বছরের জন্য রাশিয়ানদের কাছ থেকে ২৮ মিলিয়ন ডলার দিয়ে, যেটার ফুটপ্রিন্টে বাংলাদেশ পড়ে।

স্যাটেলাইট ১৫ বছর টিকবে (সাধারণত এরকমই হয়ে থাকে), তারপর আবার হয়তো এই স্লট লিজ নেবে, অথবা ততদিনে টেকনোলজি আরও ছড়িয়ে যাবে, আর স্যাটেলাইট লাগবে না। সীমিত সংখ্যক জিওস্টেশনারি স্লট আছে—একটা থেকে আরেকটা বেশ দূরে যাতে ধাক্কা না লাগে এবং একটা আরেকটার রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সিতে ঝামেলা না করে। (স্লটের দাম বাড়ছে, কমছে না। আফসোস; টংগা যদি ১৯৮৮ সালে এটা নিয়ে ভাবতে পারে, আমরা কেন নিজেদের স্লট নিয়ে তখন ভাবতে পারিনি যার ফলে এখন টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে)

বাসা বানাতে গেলে যেরকম প্রথমে জমি ঠিক করা লাগে, তারপর জমি বুঝে প্ল্যান, সেই প্ল্যান রাজউক থেকে পাশ করানো লাগে, স্যাটেলাইটের জন্যও তাই। প্রথমে জমির (স্লট) আশেপাশে কী স্যাটেলাইট আছে, তারা কোন ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে, সেগুলির সাথে যাতে কোনো সংঘর্ষ না হয়, সেটা হিসাব করে ITU ফ্রিকোয়েন্সি অনুমোদন দেয় (প্ল্যান পাশ)। তারপর স্যাটেলাইট (বাসা) বানানো লাগে। বাংলাদেশ জমি পেয়েছে, প্ল্যান পাশ হয়েছে এবং সব শেষে স্যাটেলাইট তৈরি হয়ে উড়ে গেছে মহাকাশে।

স্যাটেলাইটের কমিউনিকেশন মডিউলটি ফ্রান্সের টুলুসে অবস্থিত থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের প্ল্যান্টে যুক্ত করা হয়েছিল। ছবি: Thales Alenia Space
স্যাটেলাইটের কমিউনিকেশন মডিউলটি ফ্রান্সের টুলুসে অবস্থিত থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের প্ল্যান্টে যুক্ত করা হয়েছিল।
ছবি: Thales Alenia Space

মাত্র ১৫ বছর কেন?

সব ইলেকট্রনিক্সের মতোই, স্যাটেলাইটের ক্যাপাসিটি দিন দিন বাড়ছে আর দাম কমছে। ৫০ বছর টিকবে এমন স্যাটেলাইট বানানো সম্ভব, কিন্তু সেটা ১০-১৫ বছর পরে আর নতুন স্যাটেলাইটের সাথে পাল্লা দিতে পারবে না। তাই এগুলি এভাবেই ডিজাইন করা হয়, লাইসেন্সও ১৫ বছরের।

১৫ বছর পরে কী হবে?

স্যাটেলাইট এমনেতেই এক জায়গায় থাকে না, আস্তে আস্তে সরতে থাকে। সেটাকে মাঝে মাঝে আবার ঠিক জায়গায় আনা লাগে। যখন আয়ু শেষ হয়ে যাবে, কিছু না করলে সেটা এমনেতেই নিচে নামতে নামতে এক সময় বায়ুমণ্ডলে ঢুকবে এবং পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু যেহেতু স্লটের দাম আছে, হয়তো এভাবে নিজে থেকে নামতে না দিয়ে সেটাকে ধাক্কা দিয়ে (জ্বালানি পুড়িয়ে) নামানো হবে (দক্ষিন প্রশান্ত মহাসাগরের Spacecraft cemetery নামক এক অঞ্চলে) অথবা ধাক্কা দিয়ে আরো ২০০ কি.মি. ওপরে (graveyard orbit) তুলে দেওয়া হয় যেখানে সেই মৃত স্যাটেলাইট ঘুরতেই থাকে। আর পরবর্তী স্যাটেলাইট একই স্লট নিতে পারে বেশি অপেক্ষা না করেই।

লঞ্চ উইন্ডো (উৎক্ষেপনের মোক্ষম সময়)

প্রথমবার উড়তে গিয়েও স্পেইস এক্স (SpaceX)-র ফ্যালকন-৯ রকেট শেষ মূহুর্তে এসে উৎক্ষেপন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সমস্যা সমাধানের সাথে সাথে কেন আবার উৎক্ষেপন করা হলো না? কারণ এই লঞ্চ উইন্ডো। জ্বি না, এটা ঢাকা বরিশাল লঞ্চের জানালা নয়, এটা ঠিক কখন উৎক্ষেপণ করলে সবচাইতে কম খরচে স্যাটেলাইট জায়গামতো পৌঁছানো যাবে, সেটার একটা হিসাব। ছুটন্ত কিছুর দিকে কখনো ঢিল মেরে দেখেছেন? আপনার ঢিল পৌঁছাতে পৌঁছাতে টার্গেট সরে যায়; তাই টার্গেট আর ঢিলের গতি হিসাব করে টার্গেটের সামনে ঢিল মারা লাগে। এখানেও তাই; স্লট কোথায় সেটা হিসাব করে উৎক্ষেপণ করা লাগে কারণ পৃথিবী ঘুরছে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, উৎক্ষেপণস্থল যখন কক্ষপথ সমতলে (অরবিটাল প্লেইন; পুরো কক্ষপথকে একটা গোলাকার সমতল কল্পনা করলে যা পাওয়া যায়) থাকে তখন জ্বালানি কম লাগে। সেটা স্লটটা কোথায়, তার ওপরে নির্ভর করে। মহাকাশে কিছু পাঠানোর খরচ অনেক; প্রতি কেজি পাঠাতে খরচ প্রায় ২৫,০০০ ডলার বা ২০ লক্ষ টাকা। সুতরাং বাড়তি জ্বালানি পাঠাতেও অনেক খরচ। তাই খরচ কমানোর জন্য এই দুইটা হিসাব মাথায় রেখে দিনের যে সময়ে উৎক্ষেপণ করলে সবচাইতে কম খরচ হবে সেটাকে লঞ্চ উইন্ডো (উৎক্ষেপণের মোক্ষম সময়) বলা হয়।

রাত জেগে বাংলাদেশের অনেকেই দেখেছেন কীভাবে রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাকাশের দিকে ভেসে গেল আমাদের বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট (যারা দেখেননি তাদের জন্য উপরে পুরো ভিডিয়োটি দিয়ে দিলাম)। এই ধারাবর্ণনায় অনেকেই শুনেছেন, রকেটের স্টেইজ-২ ট্রান্সফার অরবিট-এ পৌঁছে দিল। ধরুন, প্লেনে করে বিদেশ থেকে দেশের এয়ারপোর্টে নামলেন। এবার বাসায় যাওয়ার জন্য গাড়িতে করে যেতে হবে। ট্রান্সফার অরবিট এরকম মধ্যবর্তী একটা স্থান, যেখানে রকেট থেকে স্যাটেলাইট আলাদা হয়ে যায়। এরপর স্যাটেলাইট নিজের জ্বালানি ব্যবহার করে তার নিজস্ব স্লটে পৌঁছে যাবে। এই কাজটা করবে থালিস-এর প্রকৌশলীরা; স্পেইস-এক্স এর এখানে আর কোনো ভূমিকা নেই। কিছুদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে শুরু হবে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার। দেশের দুটা উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র অন্যের স্যাটেলাইটের বদলে আমাদের নিজেদের স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ রাখবে।

বঙ্গবন্ধু-১ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৯ সালের মে মাসে SpaceX এর Falcon 9 Block 5 রকেটে। ছবি: Wikimedia Commons / SpaceX
বঙ্গবন্ধু-১ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয় ২০১৯ সালের মে মাসে SpaceX এর Falcon 9 Block 5 রকেটে।
ছবি: Wikimedia Commons / SpaceX

একটু অঙ্ক আর ফিজিক্স। ওপরে ব্যাখ্যা করা আছে; সেটাই অঙ্ক দিয়ে আলোচনা করবো

ক. আমরা জানি, পৃথিবীর সাথে তাল রাখা/ভূস্থির/জিওস্টেশনারি থাকার জন্য স্যাটেলাইটটাকে ২৪ ঘণ্টায় একবার আবর্তন করা লাগবে।

r ব্যাসার্ধের বৃত্তের পরিধি 2π . r

T = ২৪ ঘণ্টা = ৮৬,৪০০ সেকেন্ডে, এই পথ অতিক্রম করলে গতি হচ্ছে,
v = 2π .r / T

খ. কোনো ঘূর্ণায়মান বস্তুর ওপর কেন্দ্রমুখী বল, F = mv² / r (m স্যাটেলাইটের ভর, r দূরত্ব, v সরলরৈখিক গতি)

আর মহাকর্ষের সূত্র থেকে আমরা জানি, F = G M m /.r² (F বল, G মহাকর্ষ ধ্রুবক, M পৃথিবীর ভর, m স্যাটেলাইটের ভর, r দূরত্ব)। এই দুইটা সমান,
অর্থাৎ,
mv²./ r = F = G M m / r²
দুই দিকে m কাটাকাটি হয়ে গেল,
বা, v²r = G M

ওপরের সমীকরণে v = 2π . r / T বসিয়ে আমরা পাই,
(2π.r)².r/T² = G M
বা, T² = (2π)² . r³ / (G M)
বা, T²/(2π)².G M = r³

মহাকর্ষ ধ্রুবক, G = 6.67(10⁻¹¹) Nm²/kg²
পৃথিবীর ভর, M = 5.972 × 10²⁴ kg
T = 24 hours = 86,400 second

মান বসিয়ে সমাধান করলে পাই,

(86,400 s)² x 6.67(10⁻¹¹) Nm²/kg² x 5.972 × 10²⁴ kg / (2π)² = 7.53205 × 10²² m³ = r³

এটা হচ্ছে ব্যাসার্ধের কিউব। এটার কিউব রুট নিলে আমরা পাই,

r = 4.22316 × 10⁷ মিটার = 42,231.6 km.

এই ব্যাসার্ধ থেকে বিষুবরেখায় পৃথিবীর ব্যাসার্ধ 6,378 কি.মি. বিয়োগ করলে আমরা পাই, 35853.6 কি.মি.। অর্থাৎ, জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট সমুদ্রপৃষ্ট থেকে 35,853.6 কি.মি. ওপরে থাকবে (বাস্তবে আরেকটু কম/বেশি হতে পারে, উইকিপিডিয়া ৩৫,৭৮৬ কি.মি. দেখাচ্ছে। এটা অঙ্কে দশমিকের পর কয় ঘর তার ওপর বদলে যাচ্ছে)। আর আমরা যখন r পেয়ে গেলাম, তখন v = v = 2π.r/T = 2π × 42,231 / 86,400 = 3.07 km/sec

এই কেন্দ্রমুখী বল বা মহাকর্ষের জন্য স্যাটেলাইটটা সবসময় পৃথিবীর দিকে পড়তে থাকে, কিন্তু শুরুর গতিজড়তা/ঘূর্ণনজড়তার জন্য সামনের দিকেও আগাতে থাকে। এই পড়ার পরিমাণ যদি কক্ষপথের বক্রতার সমান হয়, তাহলে এটা একটা বৃত্তাকার কক্ষপথকে অনুসরণ করতে থাকবে, কখনই পড়ে যাবে না বা, মহাকাশে ছুটে যাবে না।

এই স্যাটেলাইট দিয়ে ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাবে?

কেউ কেউ এই কথাটা বলছেন বটে। কিন্তু রেডিয়ো দিয়ে যেমন টিভি দেখা যায় না, তেমনি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট দিয়ে আবহাওয়া দেখা যায় না। আমি কোনো বর্ণনাতেই পড়িনি যে এই স্যাটেলাইটে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের কোনো যন্ত্র আছে। যদি এটা ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে এটা দিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাবে না।

এই স্যাটেলাইটের ফুটপ্রিন্ট, পদচিহ্ন বা কাভারেজ এলাকা কি?

উপরে ম লেখায় ছবি দিয়ে দেখানো হয়েছে। এখানে গিয়ে 119E খুঁজে বের করলে ফুটপ্রিন্ট কেমন হবে সেটা দেখতে পাবেন। বঙ্গবন্ধু-১ এখনো এই তালিকায় নেই, কিন্ত ১১৯.১ এ অবস্থিত আমাদের স্যাটেলাইটের ফুটপ্রিন্ট বোঝার জন্য ১১৯ আর ১২০ এর ফুটপ্রিন্ট দেখলেই একটা ধারণা করা যায়।

২.
যখন বঙ্গবন্ধু-১ তার কক্ষাংশ (orbital slot) ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে পৌঁছে গিয়েছিলো ঠিক তখন ফেইসবুক জুড়ে তুফান উঠেছিলো যে, এটা খুব বাজে একটা অবস্থান। এই কারণে স্যাটেলাইট ভালো কাজ করবে না, টিভিতে ছবি ভালো আসবে না।

কথাটা কি সত্যি?

প্রথমে আমাদের তিনটা তথ্য নিয়ে আগাতে হবে।

১। যে-কোনো ভূস্থির (geostationary) স্যাটেলাইট বিষুবরেখার ওপরে থাকতেই হবে এবং তার উচ্চতা হতে হবে ৩৫,৮৬০ কি.মি. বা তার কাছাকাছি।

২। পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৬,৩৭১ কি.মি.।

৩। ঢাকার অক্ষাংশ ২৩.৮১০৩ ডিগ্রি উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ৯০.৪১২৫ পূর্ব।

ধরি, আদর্শ অবস্থান হচ্ছে P1, যেখানে ঢাকার দ্রাঘিমাতে স্যাটেলাইটটির কক্ষাংশ পড়ত। ঢাকা (D) থেকে বিষুবরেখার (P1) ওপরে যদি একটা লম্ব আঁকা হয়, তাহলে সরাসরি দূরত্ব = ২,৬৪৮ কি.মি.; আর ঢাকা থেকে ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্বে (P2, যেখানে স্যাটেলাইটটা আছে) তার দূরত্ব ৪,০৭২ কি.মি.।

(এই দূরত্ব বের করার জন্য এই ওয়েবসাইটের সাহায্য নেয়া হয়েছে। পৃথিবিকে সুষম গোলক ধরে খুব সহজেই নিজেই বের করা যায় তবে তাতে অল্প কিছু হেরফের হয়—সেই হিসাবও নিচে দেয়া আছে)

(নিচের ছবিতে দেখুন )এখন বঙ্গবন্ধু-১ যদি বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছে অর্থাৎ P1 -এর ওপরে থাকত, তাহলে সেটা একটা সমকোণী ত্রিভুজ তৈরি করত; যার ভূমি DP1 (২,৬৪৮ কি.মি.) আর উচ্চতা P1S1 = ৩৫,৮৬০ কি.মি.।

তাহলে স্যাটেলাইট থেকে ঢাকা পর্যন্ত অতিভুজের দৈর্ঘ্য (DS1), পিথাগোরাসের উপপাদ্য অনুসারে আমরা পাই:

অতিভুজের বর্গ = ২৬৪৮² + ৩৫৮৬০² = ১,২৯২,৯৫১,‌৫০৪ কি.মি.
বা, অতিভুজ = ৩৫,৯৫৭.৬৩ কি.মি.

বর্তমান অবস্থান বা P2-র ওপরে থাকায় ঢাকার সাথে আরেকটি সমকোণী ত্রিভুজ তৈরি হয়েছে, যার ভূমি DP2 (৪,০৭২ কি.মি.) এবং উচ্চতা, P2S2 = ৩৫,৮৬০ কি.মি.। তাহলে স্যাটেলাইট থেকে ঢাকা পর্যন্ত অতিভুজের দৈর্ঘ্য (DS2), পিথাগোরাসের উপপাদ্য অনুসারে আমরা পাই :

অতিভুজের বর্গ = ৪০৭২²+৩৫৮৬০² = ১,৩০২,‌৫২০,৭৮৪ বর্গ কি.মি.
বা, অতিভুজ = ৩৬,০৯০.৪৫ কি.মি.

তাহলে বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের অবস্থানে না থেকে বর্তমান অবস্থানে থাকায় দূরত্ব বেড়েছে ৩৬,০৯০.৪৫ কি.মি. – ৩৫,৯৫৭.৬৩ কি.মি. = ১৩২.৮২ কি.মি. অর্থাৎ ০.৩৭% (১৩২.৮২/৩৫,৯৫৭.৬৩)। এই এক শতাংশের চেয়েও কম দূরত্ব বাড়ায় টিভির সিগন্যালের কি কোনো তারতম্য হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮-এ তোলা ছবিতে রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে গাজীপুরের তেলিপাড়ায় বাংলাদেশের "বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১"-এর মূল গ্রাউন্ড স্টেশন বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। ছবি: Tanvir / Xinhua
৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮-এ তোলা ছবিতে রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে গাজীপুরের তেলিপাড়ায় বাংলাদেশের “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১”-এর মূল গ্রাউন্ড স্টেশন বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে।
ছবি: Tanvir / Xinhua

পদার্থবিদ্যায় ’inverse square law’ বলে একটা নিয়ম আছে, যেটাকে বাংলায় ‘বিপরীত বর্গীয় সূত্র’ বলা হয়। এই নিয়ম দিয়ে দূরত্বের সাথে কীভাবে চুম্বকের প্রভাব, আলোর পরিমাণ, রেডিয়ো, মোবাইলের সিগন্যাল, স্যাটেলাইটের সিগন্যাল কমে বা বাড়ে সেটার হিসাব করা যায়। ধরুন, আপনার হাতে একটা মোমবাতি আছে আর আপনার থেকে এক মিটার দূরে একটা সাদা দেওয়াল আছে। সেই দেওয়ালে এখন যে আলো পড়ছে, আপনি দুই মিটার দূরে সরে গেলে সেই আলোর পরিমাণ (১/২)২ অর্থাৎ ১/৪ ভাগ হয়ে যাবে। আর যদি ১ মিটারের বদলে অর্ধেক মিটার কাছে চলে আসেন, তাহলে (১/০.৫)২ অর্থাৎ চার গুণ বেড়ে যাবে। সূত্রটা সহজ—প্রথম দূরত্বকে দ্বিতীয় দূরত্ব দিয়ে ভাগ করুন, তারপর তার বর্গ করুন। তাহলে ৩৫৯৫৭.৬৩-র বদলে ৩৬,০৯০.৪৫ ১৩২.৮২ কি.মি. হলে কী হবে? আলোরপরিমাণ (৩৫,৯৫৭.৬৩/৩৬,০৯০.৪৫)২ অর্থাৎ প্রথমে যা আলো ছিল, তার ০.৯৯২৮ হয়ে যাবে অর্থাৎ আগে যদি ১০০ হয়ে থাকে, তাহলে এখন ৯৯.২৮ হবে। আপনার কি মনে হয়, ১০০ আর ৯৯.২৮ এর ভেতরে তেমন কোনো পার্থক্য হবে? আপনি হয়তো ভাবছেন, আলো আর স্যাটেলাইটের সিগন্যাল কি এক হলো? মজার কথা, আসলে পদার্থবিদদের কাছে আলো, এক্স-রে, রেডিয়ো, মোবাইলের সিগন্যাল, স্যাটেলাইটের সিগন্যাল, সবকিছুই electromagnetic wave বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং এগুলির সব কয়টাই বিপরীত বর্গীয় সূত্র মেনে চলে।

সেকেন্ডারি গ্রাউন্ড স্টেশন রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় অবস্থিত। ছবি: S M Arifur Rahman
সেকেন্ডারি গ্রাউন্ড স্টেশন রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় অবস্থিত।
ছবি: S M Arifur Rahman

সুতরাং, যারা তখন বলছে এই অবস্থানে স্যাটেলাইটের সিগন্যাল দুর্বল হয়ে যাবে, তারা না-জেনে বা না-বুঝে কথা বলেছে। ২০২১ এ এসে স্যাটেলাইট ঠিক ভাবেই কিন্তু সেবা প্রদান করছে।

পাদটিকা:

১। অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ দিয়ে দূরত্ব কীভাবে হিসাব করা হয়?
পৃথিবী গোলক আকৃতির এবং দুই মেরুতে একটু চাপা। আমাদের হিসাবের সুবিধার জন্য পৃথিবীকে একটি সুষম গোলক ধরে নিচ্ছি। তাহলে ঢাকা এবং P1 দিয়ে যাওয়া পৃথিবীর পরিধি ২ x π x ব্যাসার্ধ = ৪০,০৩০ কি.মি.। যেহেতু অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশকে ৩৬০ ডিগ্রিতে ভাগ করা হয়েছে, সেহেতু এক ডিগ্রি = ৪০,০৩০ কি.মি./৩৬০ = ১১১.৯৪ কি.মি.। তাহলে ঢাকার অক্ষাংশ যেহেতু ২৩.৮১০৩ ডিগ্রি এবং বিষুবরেখার অক্ষাংশ শূন্য, তাহলে ঢাকা থেকে বিষুবরেখার দূরত্ব = (২৩.৮১০৩ – ০) x ১১১.৯৪ কি.মি. = ২,৬৬৫ কি.মি.। খেয়াল করুন, এটা আমাদের ব্যবহৃত দূরত্বের চাইতে ১৭ কি.মি. বেশি। যেহেতু পৃথিবী আসলে সুষম গোলক নয়, তাই এই সংখ্যার তারতম্য হচ্ছে।

২। স্যাটেলাইটের বর্তমান অবস্থানের জন্য কৌণিক তফাৎ কী হবে?
এটা হিসাব করার জন্য আপনাকে একটু ত্রিকোণমিতি জানতে হবে। আদর্শ অবস্থানে থাকলে অ্যান্টেনার কোণ হতো ∠P1DS1। যেহেতু P1D = ২,৬৪৮ (ভূমি) এবং P1S1 = ৩৫,৮৬০ (উচ্চতা)। তাহলে ∠P1DS1 = tan-1 (উচ্চতা / ভূমি) = tan-1 (৩৫,৮৬০/২,৬৪৮) = ৮৫.৭৭ ডিগ্রি।

একইভাবে ∠P2DS2 = tan-1 (৩৫,৮৬০/৪,০৭২) = ৮৩.৫২ ডিগ্রি।

অর্থাৎ, অ্যান্টেনা ২.২৫ ডিগ্রি বেশি হেলানো লাগবে।

 

 লিঙ্ক:

ARTHUR C. CLARKE, Extra-Terrestrial Relays: Can Rocket Stations Give World-wide Radio Coverage?, Editor(s): Richard B. Marsten,
Progress in Astronautics and Rocketry,
Elsevier, Volume 19, 1966, Pages 3-6, ISSN 0079-6050, ISBN 9781483227160, doi: 10.1016/B978-1-4832-2716-0.50006-2.

AllEscort